রাজনৈতিক সহিংসতায় রক্তাক্ত তিতাস

Posted on by

কুমিল্লা টিভি নিউজঃ কুমিল্লার ছোট্ট উপজেলা তিতাসে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থাকলেও নেই আদর্শগত রাজনীতি। গত দুই যুগের অধিক সময় ধরে চলছে দলীয় সাইনবোর্ডের আড়ালে আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসের রাজনীতি। রাজনৈতিক কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের জেরে সশস্ত্র সহিংসতায় তিন ইউপি চেয়ারম্যানসহ ১২ জন নেতা নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে একজন বিএনপির এবং বাকি ১১ জনই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা। বাড়ি থেকে হাসিমুখে বের হয়ে তাদেরকে ফিরতে হয়েছে লাশ হয়ে। সর্বশেষ গত ২৪ মার্চ আওয়ামী লীগ নেতা মনির হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর তিতাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

জানা যায়, প্রায় ১৪ বছর আগে জেলার দাউদকান্দি উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন আলাদা করে তিতাস উপজেলা গঠন করা হয়। বেশিরভাগ ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল, নেতৃত্বের আধিপত্য, দখলদারিত্ব ঘিরে সেই নব্বই দশক থেকেই দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে রয়েছে। রাজনৈতিক ক্যাডার ও সন্ত্রাসীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠে। অবৈধ অস্ত্র ঢুকে পড়ে পাড়া-মহল্লায়।

বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, ১৯৯১ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২৭ বছরে তিতাসে রাজনৈতিক কোন্দল ও আধিপত্যের লড়াইয়ের জেরে ১২টি হত্যাকাণ্ড ছাড়াও জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ, টাকার লেনদেন, পারিবারিক কলহ, যৌতুক, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা কারণে ও তুচ্ছ ঘটনায় শতাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে দলীয় কোন্দলের জের ধরে জিয়ারকান্দিতে নির্মম খুনের শিকার হন আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা। ’৯৮ সালে স্থানীয় দলীয় কোন্দলের জের ধরে প্রতিপক্ষরা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে জিয়ারকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামানকে। ’৯৮ সালে শ্রমিক নেতা আলমকে হত্যা করে লাশ গুম করে ঘাতকরা। ২০১০ সালে নিহত চেয়ারম্যান নুরুজ্জামানের ছোট ভাই একই ইউপির চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সফিকুল ইসলামও খুন হন। ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর তিতাস উপজেলার কলাকান্দি বাজারে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রলীগের রেজাউল করিম সেন্টু নিহত হন। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের দুইগ্রুপের সংঘর্ষের সময় গাড়িচাপায় নিহত হন কুমিল্লা উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জগতপুর ইউনিয়নের মাসুম সরকার। ২০১৬ সালের ২৮ মে তিতাসের বলরামপুর ইউপি নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী কামাল উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার জন্য নিহতের স্বজনরা আওয়ামী লীগকে দায়ী করে। ওই বছরের ৮ নভেম্বর কুমিল্লা আদালতে যাওয়ার পথে খুন হন উপজেলা যুবলীগ নেতা ও জিয়ারকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান মনির হোসাইন সরকার ও তার শ্যালক মহিউদ্দিন। আট জন আহত হন। ইউপি চেয়ারম্যান মনির হত্যার রেশ না কাটতেই ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল সন্ধ্যায় আবু সাইদ ও মোহাম্মদ আলী নামে দুই যুবলীগ নেতাকে হত্যা করা হয়। তারা চেয়ারম্যান মনির হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। উভয় জোড়া খুনের মামলা তদন্ত করে জেলা ডিবি পুলিশ।

গত ২৪ মার্চ রাতে তিতাস উপজেলা আওয়ামী লীগের (একাংশ) সহ-সভাপতি ও দলের জগতপুর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাজী মনির হোসেনকে এলোপাতাড়ি গুলি করে খুনের ঘটনায় স্থানীয়দের ধারণা, তার সঙ্গে এলাকার কিছু লোকের দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত বিরোধ চলে আসছিল। এর জের ধরে তিনি খুন হতে পারেন। তবে এ ঘটনায় কেউ গ্রেফতার হয়নি। পুলিশ সুপারের নির্দেশে ঘটনার তদন্ত করছে জেলা ডিবি পুলিশ। এদিকে ঘটনার পর ভাটিপাড়া গ্রামটি পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে এবং থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, দিন যত যাচ্ছে ততই দীর্ঘ হচ্ছে দলীয় আধিপত্যের ঘটনায় হত্যা এবং সহিংস ঘটনার তালিকা। প্রতিটি খুনের ঘটনার পর মামলা হয়, ধর-পাকড়ও করে পুলিশ। নিহত নেতার কর্মী-সমর্থকরা হত্যার বিচার চেয়ে মানববন্ধন, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করে। কিন্তু কিছুদিন সরগরম থাকলেও একসময় আরও একটি ঘটনায় হারিয়ে যায় ইস্যু। ছোট পরিসরের এ উপজেলায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও চরম আতঙ্কে রয়েছেন। সব মিলিয়ে এখানকার মানুষ চরম ভীতিকর পরিবেশে দিনযাপন করছে।

’৯১ সালে নিহত আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মোল্লার মেয়ে ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক নেত্রী ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পারুল আক্তার সাংবাদিকদের জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগে কর্মীদের আগলে রাখার মতো বিচক্ষণতা নেতারা দেখাতে পারছেন না। ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা, রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্যের লড়াই এবং বিশেষ করে অভিভাবকহীন উপজেলা আওয়ামী লীগ স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। আর এ রাজনৈতিক বিভাজন থেকে তৈরি হওয়া শত্রুতার কারণে কিছুদিন পর পর প্রাণহানির মতো নির্মম ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এর ফল ভোগ করে বিরোধী পক্ষ। তিনি বলেন, কোন্দলের রাজনীতির শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আমার বাবাও। কিন্তু এর বিচার আমরা পাইনি।

তিতাস থানার ওসি মো. নুরুল আলম টিপু জানান, মনির হোসেন খুনের ঘটনা তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ। কেন বা কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা উদঘাটনে তদন্তকারী সংস্থা কাজ করছে। এছাড়া বিগত সময়ে এ উপজেলায় রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যার ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্তে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সবসময় সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করছে। এদিকে মনির হোসেন হত্যা মামলার বিষয়ে ডিবির ওসি এ কে এম মনজুর আলম জানান, এ ঘটনায় নবীর হোসেন নামে এজাহারনামীয় এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

Leave a Reply

Developed by: TechLoge

x